ঢাকা ০৬:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রেকর্ড আমদানি তবু রমজানে নিত্যপণ্যের বাজার অস্থির

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় : ০২:০৩:৫৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১৬৪ বার পড়া হয়েছে

রমজান সামনে রেখে রেকর্ড পরিমাণ নিত্যপণ্য আমদানি হয়েছে। দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে গুদামভর্তি পণ্য, বেড়েছে বেচাকেনাও। তবু রহস্যজনকভাবে বাড়ছে দাম। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না বাজার— এমন প্রশ্ন এখন ক্রেতা ও সংশ্লিষ্ট সবার।

বুধবার সকালে সরেজমিনে দেখা গেছে, চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে প্রতিটি দোকান ও গুদাম পণ্যে ঠাসা। বাজারের অলিগলি ছাড়িয়ে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের সারি গিয়ে পৌঁছেছে জেলগেট পর্যন্ত। শ্রমিকরা মাথায় করে ট্রাকে পণ্য তুলছেন, কোথাও ঠেলাগাড়িতে চলছে সরবরাহ। প্রতিটি আড়তে ক্রেতাদের ভিড়— জমজমাট বেচাকেনা।

বাজারে সরবরাহ ও বিক্রির এমন বাড়বাড়ন্ত থাকলেও দাম কমেনি, বরং বেড়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা নিয়মিত বাজার মনিটরিং ও অভিযান চালিয়ে, জরিমানা করেও নিত্যপণ্যের দামের লাগাম টানতে পারছেন না। ভোক্তাদের অভিযোগ, নির্বাচনের পর গত ছয় দিনে প্রায় প্রতিটি পণ্যের দাম কেজিতে ৫ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। কিছুদিন আগে এক সপ্তাহের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের অচলাবস্থা ও নির্বাচন উপলক্ষে সরকারি ছুটিকে অজুহাত হিসেবে দেখানো হলেও এখন সেসব পরিস্থিতি স্বাভাবিক। তবু মূল্যবৃদ্ধি থামছে না।

খাতুনগঞ্জের ব্যবসা মূলত কমিশনভিত্তিক। দেশের বড় আমদানিকারকরা এখানকার আড়তদারদের মাধ্যমে তাদের পণ্য বিক্রি করেন। নির্দিষ্ট হারে কমিশন পান ব্যবসায়ীরা। তবে কিছু বিক্রেতা এখন সরাসরি আমদানিও করেন।

ব্যবসায়ীদের দাবি, এবার রমজানকে টার্গেট করে অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশি পণ্য আমদানি হয়েছে। তবে নির্বাচনের কারণে শুরুতে বাজার জমতে সময় লাগে। পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিক আন্দোলনের প্রভাব পড়ে। সব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে বাজার সচল হলেও চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমদানিকারকরা দাম বাড়িয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

খাতুনগঞ্জ আড়তদার সমিতির সাবেক সভাপতি সোলাইমান বাদশা বলেন, দাম বাড়ানো বা কমানোর সিদ্ধান্ত মূলত আমদানিকারকদের। নির্বাচনের পর হঠাৎ তারা বেশি দামে পণ্য বিক্রি করতে বলেছে। অথচ বাজারে পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। হঠাৎ পণ্যের দাম বাড়ানোর যৌক্তিক কোনো কারণ দেখছেন না তিনি।

খাতুনগঞ্জে তিন ধরনের ছোলা বিক্রি হয়। নির্বাচনের আগে সাধারণ মানের ছোলা কেজি ৬৫-৭০ টাকা এবং ভালো মানের ৭৪-৭৫ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে সাধারণ মানের ছোলা ৭৪-৭৫ টাকা এবং ভালো মানের ৮০-৮২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

১০ ফেব্রুয়ারি ৭৪ টাকা কেজি দরের মটর ডাল এখন ৭৮ টাকা। ৭৫ টাকার মসুর ডাল বেড়ে হয়েছে ৮১-৮২ টাকা। ছোলা মণপ্রতি চার হাজার টাকা থেকে বেড়ে চার হাজার ২০০ টাকায় উঠেছে। শুকনো মরিচ কেজিতে ৪০ টাকা বেড়ে ৩৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রায় সব পণ্যে এমন মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেছে।

রমজানের সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন পণ্য খেজুর। প্রতি বছর খেজুরের বাজারে কারসাজির অভিযোগ থাকায় সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার দুই মাস আগে শুল্কহার ১০ শতাংশ কমায়। এই সুযোগে দেশে ৪৭ হাজার ৭৩ টন খেজুর আমদানি হয়েছে। আমদানি বাড়ায় প্রথমদিকে দাম কিছুটা কমলেও এখন আবার কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বিভিন্ন মানের খেজুরে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস সূত্র জানায়, রমজানে দেশে প্রায় ৩ লাখ টন ভোজ্য তেল, আড়াই লাখ টন চিনি, ১ লাখ টন ছোলা ও ৮০-৯০ হাজার টন খেজুরের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে রমজানের আগেই চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাস হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার টন ছোলা, ১০ লাখ ৩৮ হাজার টন ভোজ্য তেল, ৩ লাখ টন চিনি এবং প্রায় ১ লাখ টন খেজুর।

কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমিন জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর প্রায় প্রতিটি পণ্যের আমদানি বেশি হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাজারে সংকট তৈরির কোনো আশঙ্কা নেই। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাড়ে সাত মাসে ১৭ ক্যাটাগরির নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে ৪৭ হাজার ৪৩৮ কোটি টাকা শুল্ক আদায় হয়েছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রামের সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, রমজানকে টার্গেট করে ব্যবসায়ীরা প্রতি বছর যে সিন্ডিকেট করে, এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নির্বাচনের ব্যস্ততার মধ্যে বিষয়টি নজরে আসেনি। মধ্য রমজান পর্যন্ত মূল্য ঊর্ধ্বমুখী থাকতে পারে।

তিনি অভিযোগ করেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের সক্রিয়তা প্রত্যাশিত মাত্রায় নেই। জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

রেকর্ড আমদানি তবু রমজানে নিত্যপণ্যের বাজার অস্থির

আপডেট সময় : ০২:০৩:৫৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রমজান সামনে রেখে রেকর্ড পরিমাণ নিত্যপণ্য আমদানি হয়েছে। দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে গুদামভর্তি পণ্য, বেড়েছে বেচাকেনাও। তবু রহস্যজনকভাবে বাড়ছে দাম। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না বাজার— এমন প্রশ্ন এখন ক্রেতা ও সংশ্লিষ্ট সবার।

বুধবার সকালে সরেজমিনে দেখা গেছে, চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে প্রতিটি দোকান ও গুদাম পণ্যে ঠাসা। বাজারের অলিগলি ছাড়িয়ে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের সারি গিয়ে পৌঁছেছে জেলগেট পর্যন্ত। শ্রমিকরা মাথায় করে ট্রাকে পণ্য তুলছেন, কোথাও ঠেলাগাড়িতে চলছে সরবরাহ। প্রতিটি আড়তে ক্রেতাদের ভিড়— জমজমাট বেচাকেনা।

বাজারে সরবরাহ ও বিক্রির এমন বাড়বাড়ন্ত থাকলেও দাম কমেনি, বরং বেড়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা নিয়মিত বাজার মনিটরিং ও অভিযান চালিয়ে, জরিমানা করেও নিত্যপণ্যের দামের লাগাম টানতে পারছেন না। ভোক্তাদের অভিযোগ, নির্বাচনের পর গত ছয় দিনে প্রায় প্রতিটি পণ্যের দাম কেজিতে ৫ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। কিছুদিন আগে এক সপ্তাহের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের অচলাবস্থা ও নির্বাচন উপলক্ষে সরকারি ছুটিকে অজুহাত হিসেবে দেখানো হলেও এখন সেসব পরিস্থিতি স্বাভাবিক। তবু মূল্যবৃদ্ধি থামছে না।

খাতুনগঞ্জের ব্যবসা মূলত কমিশনভিত্তিক। দেশের বড় আমদানিকারকরা এখানকার আড়তদারদের মাধ্যমে তাদের পণ্য বিক্রি করেন। নির্দিষ্ট হারে কমিশন পান ব্যবসায়ীরা। তবে কিছু বিক্রেতা এখন সরাসরি আমদানিও করেন।

ব্যবসায়ীদের দাবি, এবার রমজানকে টার্গেট করে অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশি পণ্য আমদানি হয়েছে। তবে নির্বাচনের কারণে শুরুতে বাজার জমতে সময় লাগে। পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিক আন্দোলনের প্রভাব পড়ে। সব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে বাজার সচল হলেও চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমদানিকারকরা দাম বাড়িয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

খাতুনগঞ্জ আড়তদার সমিতির সাবেক সভাপতি সোলাইমান বাদশা বলেন, দাম বাড়ানো বা কমানোর সিদ্ধান্ত মূলত আমদানিকারকদের। নির্বাচনের পর হঠাৎ তারা বেশি দামে পণ্য বিক্রি করতে বলেছে। অথচ বাজারে পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। হঠাৎ পণ্যের দাম বাড়ানোর যৌক্তিক কোনো কারণ দেখছেন না তিনি।

খাতুনগঞ্জে তিন ধরনের ছোলা বিক্রি হয়। নির্বাচনের আগে সাধারণ মানের ছোলা কেজি ৬৫-৭০ টাকা এবং ভালো মানের ৭৪-৭৫ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে সাধারণ মানের ছোলা ৭৪-৭৫ টাকা এবং ভালো মানের ৮০-৮২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

১০ ফেব্রুয়ারি ৭৪ টাকা কেজি দরের মটর ডাল এখন ৭৮ টাকা। ৭৫ টাকার মসুর ডাল বেড়ে হয়েছে ৮১-৮২ টাকা। ছোলা মণপ্রতি চার হাজার টাকা থেকে বেড়ে চার হাজার ২০০ টাকায় উঠেছে। শুকনো মরিচ কেজিতে ৪০ টাকা বেড়ে ৩৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রায় সব পণ্যে এমন মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেছে।

রমজানের সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন পণ্য খেজুর। প্রতি বছর খেজুরের বাজারে কারসাজির অভিযোগ থাকায় সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার দুই মাস আগে শুল্কহার ১০ শতাংশ কমায়। এই সুযোগে দেশে ৪৭ হাজার ৭৩ টন খেজুর আমদানি হয়েছে। আমদানি বাড়ায় প্রথমদিকে দাম কিছুটা কমলেও এখন আবার কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বিভিন্ন মানের খেজুরে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস সূত্র জানায়, রমজানে দেশে প্রায় ৩ লাখ টন ভোজ্য তেল, আড়াই লাখ টন চিনি, ১ লাখ টন ছোলা ও ৮০-৯০ হাজার টন খেজুরের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে রমজানের আগেই চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাস হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার টন ছোলা, ১০ লাখ ৩৮ হাজার টন ভোজ্য তেল, ৩ লাখ টন চিনি এবং প্রায় ১ লাখ টন খেজুর।

কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমিন জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর প্রায় প্রতিটি পণ্যের আমদানি বেশি হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাজারে সংকট তৈরির কোনো আশঙ্কা নেই। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাড়ে সাত মাসে ১৭ ক্যাটাগরির নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে ৪৭ হাজার ৪৩৮ কোটি টাকা শুল্ক আদায় হয়েছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রামের সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, রমজানকে টার্গেট করে ব্যবসায়ীরা প্রতি বছর যে সিন্ডিকেট করে, এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নির্বাচনের ব্যস্ততার মধ্যে বিষয়টি নজরে আসেনি। মধ্য রমজান পর্যন্ত মূল্য ঊর্ধ্বমুখী থাকতে পারে।

তিনি অভিযোগ করেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের সক্রিয়তা প্রত্যাশিত মাত্রায় নেই। জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।