মূল অংশে যান

প্রবাসে অনিশ্চয়তা, পরিবারে উদ্বেগ

ইরানে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ইরান মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশের মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। হামলা ও পাল্টা হামলা চলছেই। এতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিরতা বিরাজ করছে। এর মধ্যে যুদ্ধের ১০ দিন পার হয়েছে।

এতে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্দান, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীরা চরম অনিশ্চয়তা মধ্যে পড়েছেন। বাংলাদেশে থাকা প্রবাসীদের পরিবারও উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে রেমিট্যান্স প্রবাহে ভাটা পড়ার শঙ্কা রয়েছে।

সূত্র জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশের ৫০ লাখের বেশি প্রবাসী রয়েছেন।

যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তাঁদের অনেকের কর্মস্থল বন্ধ রয়েছে। তাঁরা ভয়ে কোথাও যেতে পারছেন না। এমনকি ভয়ে বাসার ভেতরও থাকতে পারছেন না। নানা সময় প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সাইরেনে এক ধরনের আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রবাসী কর্মীরা।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর প্রবাসীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের অবস্থার কথা জানান দিচ্ছেন। তাঁরা বোমা হামলা, মানুষের আতঙ্ক, চিত্কার ও ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র তুলে ধরছেন।

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে সৌদি আরবে দুজন, বাহরাইনে একজন, দুবাইয়ে একজন, কুয়েতে একজন রয়েছেন। দুবাইয়ে নিহত মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার বাসিন্দা আহমদ আলীর মরদেহ গত সোমবার দেশে পৌঁছেছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, ‘আমাদের বাংলাদেশি প্রবাসী ভাইয়েরা যাঁরা মধ্যপ্রাচ্যে আছেন, তাঁদের প্রতি আমাদের একটি আহবান থাকবে—যতটুকু সম্ভব সংঘাতপূর্ণ এবং বিশেষ করে যে স্থানগুলো আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে, সেসব এলাকা এড়িয়ে চলার জন্য। সতর্কতার সাইরেনসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলো যে দিকনির্দেশনা দিচ্ছে, সেগুলো মেনে চলতে হবে।’

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি ক্রাইসিস টিম গঠন করা হয়েছে। এই টিমের মাধ্যমে যুদ্ধের কারণে যাঁরা ঘর থেকে বের হতে পারছেন না, তাঁদের খাদ্য সহায়তা এবং আহতদের চিকিৎসাসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। প্রবাসীদের সংকট মোকাবেলায় সরকারের পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। প্রবাসীদের জন্য যা যা করা প্রয়োজন, সরকার তা করবে।’

জানা যায়, বাংলাদেশের শ্রমবাজার অনেকটাই মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। আমাদের মোট অভিবাসীর ৬৭ শতাংশই যান সৌদি আরবে। শ্রমবাজারের দ্বিতীয় স্থানে কাতার, চতুর্থ কুয়েত, ষষ্ঠ আরব আমিরাত ও সপ্তম স্থানে রয়েছ জর্দান। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় প্রতিটি দেশেই যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বড় ঝুঁকিতে পড়েছে আমাদের শ্রমবাজার। এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব পড়বে রেমিট্যান্সে।

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। ২০২৫ সালে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩২.৮ বিলিয়ন ডলার, যা অন্য যেকোনো বছরের চেয়ে বেশি। কিন্তু এই যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এ বছর রেমিট্যান্স নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকেই।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশীয় এয়ারলাইনস মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় তাদের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ থেকে বাহরাইন, কুয়েত, দুবাই, কাতার, সৌদি আরবসহ এই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করা বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোও তাদের বেশির ভাগ ফ্লাইট স্থগিত করেছে। এতে অনেক প্রবাসী তাঁদের কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না। অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। কোনো কোনো দেশ এক মাস ভিসার মেয়াদ বাড়ালেও তারও কয়েক দিন পার হয়ে গেছে। অনেকেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যেতে ভয় পাচ্ছেন। আবার নতুন করে যাঁরা প্রবাসজীবনে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন সেখানেও ভাটা পড়েছে। অনেকের ভিসা হলেও তাঁরা যেতে পারছেন না। আবার যাঁরা মধ্যপ্রাচ্যের দেশ থেকে বাংলাদেশে আসার পরিকল্পনা করেছিলেন বা টিকিট করেছিলেন তাঁরাও ফিরতে পারছেন না।

পবিত্র ঈদুল ফিতর আসন্ন। প্রতিবছর ঈদ উপলক্ষে দেশে রেমিট্যান্সের জোয়ার সৃষ্টি হয়। প্রবাসীরা নিজেরা কষ্ট করে হলেও পরিবারের জন্য ঈদ উপলক্ষে বেশি টাকা পাঠান। আবার অনেকে পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে দেশে আসেন। কিন্তু এ বছর প্রবাসীরা আগের মতো টাকা পাঠাতে পারছেন না। আবার তাঁদের দেশে থাকা পরিবার আতঙ্কে-উদ্বেগে রয়েছে। তারা প্রতিটি ক্ষণই দুশ্চিন্তার মধ্যে পার করছে।

মতামত দিন